১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠা ছিল জিয়াউর রহমানের চিন্তা ও পরিকল্পনার প্রতিফলন, যার জন্য তাঁকে সার্কের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়।ছবি: সংগৃহীত
আ ন ম মুনীরুজ্জামান
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব...
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত ভিত্তি নির্মাণ এবং স্বতন্ত্র গতিপথ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান স্থপতি হলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ কিংবা ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখা হচ্ছিল, তখন দেশের পররাষ্ট্রনীতিও ছিল একটি সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ।
পশ্চিমা বিশ্ব থেকে অর্থপূর্ণ সহায়তা অর্জন, মুসলিম বিশ্ব ও বৃহত্তর আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা, আঞ্চলিক ইস্যুতে দৃঢ়তার সঙ্গে সার্বভৌম স্বার্থ প্রতিষ্ঠা এবং একটি স্বতন্ত্র কূটনৈতিক পরিচয় নির্মাণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে তখন উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।
সেই পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক বাস্তববাদী ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক পুনর্গঠনের সূচনা করেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আদর্শিক আনুগত্য বা আবেগনির্ভর অবস্থানের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করতেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মূলত বাস্তবতাভিত্তিক, যেখানে পররাষ্ট্রনীতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ নিশ্চিত করা।
এ পরিপ্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমান একদিকে নিরপেক্ষতা ও নির্জোট নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বাস্তববাদী ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার পথ অনুসরণ করেন।
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য ছিল আদর্শিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা।
এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই তিনি পশ্চিমা বিশ্ব, চীন, জাপানসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন ও জোরদারের উদ্যোগ নেন, ফলে একদিকে যেমন উন্নয়ন সহযোগিতা, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহায়তার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়; অপর দিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একটি সংকীর্ণ ও সীমিত পরিসর থেকে বেরিয়ে এসে ক্রমশ বহুমুখী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং স্বার্থকেন্দ্রিক রূপ লাভ করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান ও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বাংলাদেশ নিজেকে কেবল সাহায্যনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে নয়; বরং একটি সম্ভাবনাময় ও দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অর্থনৈতিক কূটনীতিকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ, বিশেষ করে সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ছিল এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ফলে বিদেশি শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়ে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।
একই সঙ্গে এই উদ্যোগ দেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করে। আজ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস হিসেবে প্রবাসী আয় যে ভূমিকা রাখছে, তার ভিত্তি এই সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয়।
অর্থনৈতিক কূটনীতির পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করাকেও পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখেছিলেন।
বাংলাদেশ আল-কুদস কমিটির সদস্য হিসেবে এর কার্যক্রমে সক্রিয় সমর্থন জানায়। তাঁর সময়ে ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থান আরও সুস্পষ্ট ও দৃঢ় হয়ে ওঠে, যা মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সংহতি গভীর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই অবস্থানের প্রতীকী ও কৌশলগত প্রতিফলন দেখা যায়, ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের বাংলাদেশ সফর, যা আরব ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার নতুন মাত্রা সৃষ্টি করে।
এই সময়ে ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরান-ইরাক যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ওআইসির মধ্যস্থতা প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। জটিল ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের মধ্যেও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখে বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে অংশ নেয়।
এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যে একটি দায়িত্বশীল ও মধ্যপন্থী রাষ্ট্র হিসেবে তার ভাবমূর্তি গঠনে সহায়ক হয়।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও নতুন গতিশীলতা পায়। উন্নয়ন সহায়তা, খাদ্য সহযোগিতা এবং কৃষি ও অবকাঠামো খাতে সহায়তা বৃদ্ধি পায়, যা বাংলাদেশের উন্নয়ন কাঠামোকে পশ্চিমা উন্নয়ন ব্যবস্থার সঙ্গে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত করে।
একই সময়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৭৭ সালের সফরে জিয়াউর রহমান চীনের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং পরবর্তী সময়ে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়, যা বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে ফারাক্কা ইস্যু ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় ও সংবেদনশীল প্রশ্ন। ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন ইস্যুতে আলোচনাভিত্তিক কূটনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টা শুরু হয়, যা পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সংলাপের একটি ভিত্তি তৈরি করে।
একই সময়ে ১৯৭৮ সালের রোহিঙ্গা সংকট এবং মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলে ‘কিং ড্রাগন অপারেশন’-পরবর্তী শরণার্থী প্রবাহ বাংলাদেশকে মানবিক ও কূটনৈতিকভাবে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উদ্যোগে এবং জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এর কাঠামোগত সহায়তায় প্রত্যাবাসন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, যা ১৯৭৯ সালের মধ্যে আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়।
এবং সেই সময়ের কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রেও এই সময় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে।
বঙ্গোপসাগরে এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন(ইইজেড) নির্ধারণ এবং সামুদ্রিক সীমা নিয়ে ভারতের ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়, যা ভবিষ্যতের সামুদ্রিক অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে দেয়।
প্রতিরক্ষা কূটনীতির ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে তাঁর কানাডা সফরকালে সম্পাদিত কার্যক্রম এবং যুক্তরাজ্যের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা গ্রহণের প্রক্রিয়া নবগঠিত সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল ১৯৭৭ সালে মিরপুরে প্রতিষ্ঠিত সামরিক বাহিনী কমান্ডো স্টাফ কলেজ, যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সামরিক পেশাদারির কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকশিত হয়।
বহুপক্ষীয় কূটনীতি ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা সম্প্রসারণে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ও দৃঢ় ভূমিকা পালন করেন।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদ অর্জন ছিল এই প্রচেষ্টার ফল। জাপানের মতো প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রকে পরাজিত করে এই আসন লাভ বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই সময় আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন ও কম্বোডিয়া প্রশ্নে বাংলাদেশের নীতিনিষ্ঠ অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ এই ধারাবাহিকতারই ফল, যার ভিত্তি এই সময়েই তৈরি হয়।